মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভৌগলিক পরিচিতি

 

কালকিনি উপজেলার উত্তরে মদারীপুর সদর ও শরিয়তপুর সদর উপজেলা, দক্ষিণাংশে গৌরনদী ও মূলাদী উপজেলা, পশ্চিমে কোটালিপাড়া উপজেলা, পূর্বে  গোসাইরহাট, মূলাদী ও ডামুড্যা উপজেলা। আড়িয়াল খাঁ, পালরদী, টরকী ও বিশারকান্দি প্রধান নদী।

কল্যাণ লেখক কৃষ্টি ও নৈতিকতা নিয়েই কালকিনি থানা এবং বর্তমানে কালকিনি উপজেলা । ১৯৯৩ সনে লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে দেশের তথা ভারত বর্ষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পেক্ষাপটে চিরস্থায়ী  বন্দোবস্ত আই পাশ হয়। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় জমিদার শ্রেণি। জমিদারগণ রাজস্ব আদায় ও স্থানীয় শান্তি-শৃঙ্খলার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। জমিদারগণ বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় জনকল্যাণমূলক কাজ থেকে ক্রমশই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফফে শান্তি-শৃঙ্খলার পরিবর্তে বহু ক্ষেত্রেই অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আই সময়টি ছিল ১৮৭০ সাল পর্যন্ত। এরপরে অঞ্চলের পথ পরিবর্তন ঘটে নতুন আর একটি অধ্যায়ের শুরু হয়।

১৮৭০ সনের পূর্বেকার সময়ে ইংরেজ শাসনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের অধীনে কালকিনি থানা অঞ্চলকে ক্ষুদ্র ভাগে জমিদার শাসন এলাকা হিসাবে বিভক্ত করে জমিদারী প্রথায় শাসন করেছিল। তখন কালকিনি থানার  কতিপয় মুসলমানও জমিদার ছিলেন। তবে মুসলিম জমিদারগণ হাওলাদারও তালুকদার বংশ বেশি ছিলেন।

কালকিনি উপজেলা ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে সাহাবরামপুর এলাকার জমিদার মি: এ্যাওয়ার্ড শেওলাপট্রি এলাকার জমিদার বৈকুন্ঠ রায় চৌধুরী। বাজিতপুর এলাকার রাজ কুমার মজুদার। গোপালপুর ইউিনয়নের জমিদার আ: রব চৌধুরী । এনায়েতনগর ইউনিয়নের জমিদার রাজ মোহন দাস। বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের জমিদার ওয়াসেক উদ্দিন তালুকদার। লক্ষীপুর ইউনিয়নের জমিদার ভগোল সুন্দরী। লক্ষীপুর উইনয়নের অন্তর্গত জালালপুর পরগণার জমিদার ভগোলা স্দুরীর জমিদারী আওতাভূক্ত এই জমিদারের বিশ্বস্ত কালেক্টর বা নায়েব ছিলো ‌‍"দামুসা "

প্রাচীন কালের অনেক কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের নিদর্শণ কালকিনি উপজেলায়। সেই ঐতিহ্যকে এখনো এলাকাবাসীর নিদর্শণ হিসাবে মেলা বা গোলেয়া এখনো প্রচলিত। প্রতি বাঙলা সনের ৩০ চৈত্র- চৈত্রসংক্রান্তি বা বাংলা বর্ষকে বিদায় এবং নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার লক্ষে জালালপুর পরগোনা এলাকায় "দামুসা" মেলা বসে।

তদ্রুপ কালকিনি উপজেলার শেওলাপট্রি, সিডি খানের বটতলা, রায়পুরের রক্ষাচন্ডি চৈত্রসংক্রান্তিতে মেলা বসে। তবে ভগোলা সুন্দরী প্রিয় ব্যক্তিদের নামে "দামুসা" মেলা ইংরেজী আমল থেকে এখন প্রচলিত। জালালপুরে বা ইদিলপুর পরগোনা নামে বর্তমানে কোন মৌজা নেই। তোসিএস এবং আরএস জমি জরিপের পর্চায় জালালপুর ও ইদিলপুর জমিদার পুর্নেন্দ্রনাথ সরকার নাম ছাপা অক্ষরে প্রমানিত রয়েছে। অপরদিকে  তিতুমীরের শহীদ  হওয়ার পর হাজী শরীয়ত উল্লাহর ফরয়েজী আন্দোলনের সময় ইংরেজ সেনাপতি "ডানলপ" বাহিনীর সাথে ফরায়েজী বাহিনীর যুদ্ধের সময় ইংরেজগণ পরাজিত হয়ে পালাবার সময় "দামুসা" নিহত হন ১৮৭০ সনে।তারই স্মৃতিই স্মরণে জমিদার ভগোলা সুন্দরী মেলার আয়োজন করেছিল তাই মেলার নাম করণ হয় দামুসা মেলা।

জালাপুর বা ইদিলপুর পরগোনার মুল মৌজার নাম লক্ষীপুর। "দামুসা মেলা" র প্রায় এক বর্গমাইল আয়তনের জায়গা ছিল। বর্তমানে জনবসতিপূর্ন ও চাষাবাদের ফফে "দামুসা মেলা" র জায়গা ক্ষীণ হয়ে আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ঐ এলাকার আর এস এবং এস এ কোন জরিপেই হয় নাই।

কালকনি থানা একটি পরিবর্তিত নাম । মাদারীপুর মহকুমার উজানে পদ্মা নদী আ দক্ষিণে মেঘনা নদীর মধ্যস্থল ভাগের সংযোগে রক্ষাকারী আড়িয়াল খা নদী। কালকিনি ভৌগোলিক অবস্থানে এ অঞ্চলের ভূ-গঠনে প্রবাহিত নদীগুলোর ভূমিকা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ । কালকিনি থারার ভূ-ভাগের মধ্যে দিয়িআড়িয়াল খা নদী, পালদী নদী, গজারিয়া নদী, কাচিকাটা -তুলাতলা নদী স্নানঘাটা নদী(ছোট গাঙ) এবং টেংরা নদীর সিকস্তি ও চরাঞ্চল এলাকায় বেলে  মাটির আধিক্য অত্যান্ত বেশি

তবে এ উজজেলার আবাসযোগ্য জমির জনবসতি খুব প্রাচীন নয়। হাজার বছরের ভূ-গঠন প্রক্রিয়ায় চলছে প্রকৃতির বিচিত্র লীলার লীলায়িত ভাঙ্গা-গড়ার বিচিত্র অভিজ্ঞতায় বিকশিত এক বিস্ময়কর ঐতিহ্যের স্মারক।ভূ-প্রকৃতি নিয়ত : ভাঙ্গা-গড়ায় এ এলাকার পূর্ব -দক্ষিণাঞ্চলে সুগভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে। এখানকার মানুষ সিংহশার্দুল, সংগ্রামী । এখনও শান্ত-সৌম্য-সংযমী। কঠোরতা-কোমলতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণে পল্লবিত এখানকার গণমানুষ কালকিনি থানা বা উপজেলার পশ্চিম উত্তর অঞ্চলের স্থলভাগ ও জনবসিতি অনেকটা একেবারেই স্থিতিশীল। এবং প্রাচীনত্বের দাবিদার।

তবে পূর্বাঞ্চলের লক্ষীপুর, বাশগাড়ী, চরদৌলত খান ,সাহেবরামপুর, রমজানপুর, শিকারমঙ্গল ও এনায়েতনগরসহ পালরর্দী নদীর পশ্চিমপাড় এলাকা এক সময়ে গভীর জঙ্গল পরিপূর্ণ ছিল। বাঘ, ভালুক, চিতাবাঘ, মহিষ, বানর ও শুকরের আস্তান্ ছিল এই কালকিনির অঞ্চলে। ১৭৯২ সালে বাঘ শিকারের জন্য সরকারীভাবে পুরস্কৃত করা হতো। বিষয়টি এখনো কথিত আছে। ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত শীত মৌসুমে ঘোসের হাট, শেওলাপট্রি এবং পূর্বাঞ্চলের গজারিয়া ও টেংরা নদীর উভয় অঞ্চলের বনভূমিতে মহিষের সমাগম ছিল। সে সময়ে শখ করে মানুষ ঘোড়া লালন-পালন করত। নিজের বাহন হিসাবে ব্যবহার করতো । একটু সৌখিন মেজাজের মাসুষেরা ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করতো। ১৯২৬ সালে স্নানঘাটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর মুলাদীর ছফিপুরের মাওলানা আধ মাজেদ নিয়মিত ঘোড়ায় চড়ে মাদ্রাসায় আসতেন। এছাড়া ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযোদ্ধের পূর্বে ও পরেও ১৯৭৩/৭৪ সাল পর্যন্ত পাঙ্গাশিয়া ও শেওলাপট্রির জঙ্গলে শুকর এ বানর-হনুমান দেখা যেত। বর্তমানে এ প্রজাতিগুলো এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে এখানকার খরস্রোতা নদী-নালা। টেংরা নদী, রাজমনী নদী ও গজারিয়া নদী এখনো নদী নামের স্মারক বহন করে আছে। তবে ডাকের চর নদী এ গজারিয়া নদী শত বছর পর্যন্ত নামের স্বার্থখতা বহন করে এখন  শুধু গজারিয়া ও ডাকের চর খাল ক্ষীণাবস্থায় বয়ে চলেছে। এই দুইটি খালই বাঁশগাড়ী ইউনিয়ননের রয়েছে।

রাজমনী নদী পালরদী নদীর ঠাকুর বাড়ি থেকে উৎপত্তি হয়ে শিকারমঙ্গল ও এনায়েত নগর ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে আঁকা- বাঁকা বয়ে গেছে ভবানীপুর ও মৃধা কান্দির নিকট আড়িয়াল খা নদীতে পতিত হয়েছে। এই নদী এখন শুধুই ঠাকুর বাড়ি , সমিতির হাট, মিয়ার হাট খাল।কথিত আছে যে, জমিদার রাজ মহন দাসের বাড়ির নিকট দিয়ে প্রবাহিত বলে রাজমনি নদীর নাম পত্তন ঘটেছেল। অপর একটি বেশি দৈর্ঘ খাল যেখানে  বর্ষায় দুর্গাপুজা উৎসবে নৌকা  বাইচের জন্য বিখ্যাত ছিল। এই খালটি মাদারীপুর সদর থানার ঘটকচর-মস্তফাপুর কুমার নদী থেকে ডাসার ,কাজী বাকাই, গোপালপুর ও বর্তমান কালকিনি পৌরসভার দক্ষিণ-পশ্চিম খাঞ্জাপুর সীমানা দিয়ে ঝুরগাও বাজারের পশ্চিমপাড়ে মাইর্ড্যাল খেয়াঘাটের নিকট পালরদী নদীতে উপনিত হয়েছে। এই খালটির নাম আমানতগঞ্জ খাল। কাল প্রবাহে এখন খাল নামেই পরিচিত । তবে এই খাল সমূহের যৌবনে পালরদী ও কুমার দনীর মতোই খরস্রোত ছিল।অপর একটি খাল শরীয়তপুর জেলার পট্রি বাজারের পদ্মা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে নাগের পাড়া, খাসের হাট, কাচরী বাজার, আকাল বরিশ হয়ে আড়িয়াল খা নদীতে মিলিত হয়েছে। এই খালটি যৌবনে টেংরা নদী নামে পরিটিত ছিল। এই টেংরা নদী দেয়ে এক সময় নারায়নগঞ্জ ,ঢাকা ,চাঁদপুর থেকে পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী জাহাজ ও স্টিমার আড়িয়াল খা নদী ও কুমার নদী হয়ে কোলকাতা যেত এবং আসতো। ইরেজ আমলে ১৮০০ সালের শেষ দিকে টেংরা নদীর ভঙ্গণে নদীর দুই পাড়ের লোকজন গৃহহীন হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে দেখা দেয় চরম দুর্ভিক্ষ।

তখন ইংরেজ শাসক নদীর দুই পাড়ের অসহায় মানুষের জন্য আশ্রয় শিবির তৈরি করে তাদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করে । এই  শিবিরের খাদ্য সামগ্রী টেংরা নদী দিয়ে কোলকাতা থেকে জাহাজ -স্টীমার যোগে আসতো। এই নদী পাড়ের আশ্রয় শিবিরের লোকদের আকালী বলা হতো। সেই থেকে নদীর দুই পাড়ের মৌজার নাম আকাল বরিশ নামে পরিচিত । পরবর্তী কালে ভূমি জরিপে উত্তর ও দক্ষিণ আকাল বরিশ রাখা হয়।

কালকিনি উপজেলার আদিবাসী কারা, কোথা থেকে তাদের আগমন ঘটেছিল আর কোথায় চলে গেছেন তা-বলা কঠিন। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, কালকিনি উপজেলার মুসলমান বনেদী পরিবারগুলো বহিরাগত । সৈয়দ, খন্দকার, চৌধুরী হাওলাদার, ভূইয়া, তালুকদার এদের অন্তর্ভূক্ত। অন্যদিকে ব্রাক্ষণ সম্প্রদায়ের বসবাস এখানে অনেক আগে থেকে তাছাড়া কায়স্থ, সাহা, মালো ইত্যাদি হিন্দু সম্প্রদায় তখনও ছিল এখনও আছে। তবে নিবর্নের হিন্দু নাম সম্প্রদায়ের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি ছিল। বাঁগাড়ী, আলীনগর,কাজীবাকাই,মাইজপাড়া, ঘোষেরহাট,নবগ্রাম, শশিকর এলাকার জলাভূমিতে ও বিল অঞ্চলের এরা প্রধান আধিবাসী। হিন্দু জমিদার ও উচ্চ বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের অত্যাচার ও শোষণের কারণে এরা নিরাপদ আশ্রয়য় নিয়েছিল। ভৌগলিক দৃষ্টিতে দেখা যায় নদী প্রবাহিত এলাকা আগীনগর,এনায়েতনগর,বাঁশগাড়ী,শিকারমঙ্গল, চরদৌলত খান, সাহেবরামপুর, কয়ারিয়া ও রমজানপুর ইউনিয়নের নদীর তীর বা চরাঞ্চলের মুসলমানদের আবাসন। যদিও নদীর ভাঙ্গা-গড়ার খেলা কৌতুহলের বিষয়। এ এলাকার নাম শুদ্র সম্প্রদায়ের নারীরা এবং গরীব মুসলমান নারীদের অনেককে পুরুষের মতো ধুমপান করতে দেখা গিয়েছে আদীকাল থেকেই।

প্রাচীন অনেক নিদর্শণ কালকিনি থানাতে রয়েছে। এই উপজেলার বালীগ্রাম ইউনিয়নের আমড়াতলা ও খাতিয়াল গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে আড়াই হাজার একর জমিতে সেনাপতির দিঘি রয়েছে।শীত মৌসুমে নানা প্রকার হাজার হাজার অতিথি পাখি ঐ দিঘিতে শীত অবকাশ যাপন করে। জনশ্রতিতে জানা যায় এখানে কিছুুদিন অতিবাহিত করেন। পানীয় জলের অভাব মেটাতে সেনাবাহিনী দ্বারা এই দিঘি খনন করা হয়। এ কারণেই এই দিঘির নাম করণ করা হয় সেনাপতির দিঘি।

কালকিনি উপজেলায় ইসলাম ধর্মেরআগমন ও বিকাশের পূর্বে হিন্দু ধর্ম ছিল প্রধান। এখানকার প্রাচীন জনগোষ্ঠী ছিল হিন্দু ধর্মালম্বী। দশম শতাব্দীতে এ এলাকায় কিছু  কিছু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বসবাসের প্রাচীর ইতিহাস পাওয়া যায়। ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ এলাকায় পীর-দরবেশ আউলিয়ার আগমন ঘটেছে। সেই সুবাদে এই এলাকার একটি মৌজার নাম আউলিয়ার চর।

হযরত পীরজাদা শাহ সুফি এনায়েতপুরী (র) সাহেবের বর্জার (ইঞ্জিনবিহীন বড় নৌকা) নেঙর করে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন যেকারণে এই মৌজার নাম এনায়েতনগর হয়েছে এবং সেই থেকে এই মৌজা ও ইউনিয়নের নাম এনায়েতনগর।